স্বাস্থ্য

ডেঙ্গুতে ২১ দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানহারা পরিবার

ডেঙ্গুতে ২১ দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানহারা পরিবার
ডেঙ্গুতে ২১ দিনের ব্যবধানে দুই সন্তানহারা পরিবার
এই সংবাদটি শুনুন বাংলা
1 মি.

২১ দিনের ব্যবধানে ডেঙ্গুতে দুই ছেলেকে হারিয়েছেন বাবুল হক ও নাজমিন আক্তার দম্পতি। দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকের ভারে ভেঙে পড়েছে পরিবারটি।

২১ দিনের ব্যবধানে দুই ছেলেকে হারালেন বাবুল-নাজমিন দম্পতি

ডেঙ্গুতে মাত্র ২১ দিনের ব্যবধানে দুই ছেলেকে হারিয়েছেন রাজধানীর ভাসানটেক এলাকার বাসিন্দা বাবুল হক ও নাজমিন আক্তার দম্পতি। ছোট ছেলে মো. ইনতিসার হাসান ইয়াসের মৃত্যু হয় ২১ সেপ্টেম্বর। এরপর ১২ অক্টোবর মারা যান তাঁদের বড় ছেলে মো. নাজমুল হাসান ইফতি। দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাজমুলের বয়স ছিল ২৪ বছর এবং ইনতিসারের ১৬ বছর। নাজমুল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিষয়ে পড়াশোনা করতেন। ইনতিসার পড়ত আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলের নবম শ্রেণিতে।

অসুস্থতা ও চিকিৎসার মধ্যেই দুই সন্তানের মৃত্যু

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবা বাবুল হক ও ছোট ছেলে ইনতিসার প্রায় একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ইনতিসারের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে বাসায় ফেরার অনুমতি দেন। পরে আবার অবস্থার অবনতি হলে তাকে রাজধানীর পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২১ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।

ছোট ছেলের মৃত্যুর সময় বাবুল হকও ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। বাবার অসুস্থতার সময় বড় ছেলে নাজমুল তাঁর পাশে ছিল। ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর পরও সে মা-বাবার দেখাশোনা করছিল। কিন্তু অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১২ অক্টোবর তারও মৃত্যু হয়।

নাজমিন আক্তার প্রথম আলোকে জানান, দুই ছেলেকে হারানোর পাশাপাশি স্বামীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্তানদের সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার আশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পূরণ হয়নি।

পরিবারের শোকের সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গুর উদ্বেগ

নাজমিনের ভাষ্য, দুই ছেলে সব সময় তাঁর কাছাকাছি থাকত। তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময়, পারিবারিক পরিকল্পনা ও দৈনন্দিন স্মৃতি এখন তাঁর কাছে গভীর বেদনার কারণ। দুই সন্তানকে হারানোর পর পরিবারটি যে মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা এই ঘটনার মানবিক দিকটি সামনে আনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রথম আলো জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে ৩৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২৫৯ জন। শুধু ১৫ অক্টোবরের আগের ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৪৩ জনের হাসপাতালে ভর্তির তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে ৩২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা আগের বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিসংখ্যান ডেঙ্গু প্রতিরোধ, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশের পরিবেশে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। ফুলের টব, জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র ও ছাদের বিভিন্ন স্থানে পানি জমছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

  • বাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করুন।
  • পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখুন এবং নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
  • দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে বাঁচতে উপযুক্ত প্রতিরোধব্যবস্থা নিন।
  • জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান।
  • তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা চেতনার পরিবর্তন হলে জরুরি চিকিৎসা নিন।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত প্রত্যেক রোগীর অবস্থা একই রকম থাকে না। তাই জ্বর কমে গেলেই ঝুঁকি কেটে গেছে ধরে নেওয়া ঠিক নয়; চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

সূত্র: প্রথম আলো, মানসুরা হোসাইনের প্রতিবেদন; ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিসংখ্যানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যের বরাত দেওয়া হয়েছে।

Comments

You must be logged in to post a comment.